এবার নতুন এক ধরনের ডেঙ্গু শনাক্ত ! দেখুন বিস্তারিত

এডিস মশার মাধ্যমে দেশে এবার নতুন এক ধরনের ডেঙ্গু জ্বর দেখা যাচ্ছে। যা ‘ডেনভি-৩’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নতুন এ ধরন ডেঙ্গু আক্রান্তদের তুলনামূলক ‘অধিক মৃত্যুর’ অন্যতম প্রধান কারণ।

ডেঙ্গুর জিনোম সিকোয়েন্স করে এই তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)।

জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশে রোববার বিসিএসআইআর আয়োজন করে এক সংবাদ সম্মেলনের। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সি এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে দেশে প্রথম এই ধরন শনাক্ত হয়। ২০১৭ সালের আগে ডেনভি-১ ও ডেনভি-২-এ আক্রান্ত হয়ে অনেকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠেছে। কিন্তু ডেনভি-৩-এর বিরুদ্ধে এই ক্ষমতা কার্যকর হচ্ছে না।’

সাইফুল্লাহ মুন্সি বলেন, ‘যারা আগের দুই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত, তারা নতুন করে ডেনভি-৩ আক্রান্ত হলে হেমোরেজ বা সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়ছেন। সে কারণে এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এই জিনোম সিকোয়েন্সিং ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন উৎপাদনে সহায়ক হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে বিসিএসআইআর-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সেলিম খান বলেন, ‘করোনার মতো ডেঙ্গু নিজে নিজে রূপ বদলাতে পারছে না। ডেঙ্গু প্রাকৃতিকভাবেই পরিবর্তন হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এবার ডেঙ্গু আক্রান্তদের বেশির ভাগের শরীরে ডেনভি-৩ ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে। আর ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে অন্য বছরের তুলনায় মৃত্যুও বেশি হচ্ছে।’

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ২০টি নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স করে এই তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) গবেষকরা।

বিসিএসআইআরের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাে. আফতাব আলী শেখ বলেন, ‘ডেঙ্গুর চারটি সেরােটাইপ যা ডেনভি-১, ডেনভি-২, ডেনভি-৩ এবং ডেনভি-৪-এর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এই ভাইরাসের ৪টি সেরােটাইপের মধ্যে ৬৫-৭০ শতাংশ এমিনাে অ্যাসিড সিকোয়েন্সের মিল আছে। ভাইরাসটি এডিস মশা দ্বারা বাহিত হয় এবং মশার মাধ্যমে মানবদেহে সংক্রমিত হয়। ১৯৬০ সালে পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।’

তিনি জানান, বিশ্বে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মশকবাহিত রােগ ডেঙ্গু। প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মানুষ এর সংক্রমণের ঝুঁকিতে আছে। ইতােমধ্যে এ রােগটি বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে বিস্তার লাভ করেছে। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।

প্রতিবছর বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যায় এবং এটি বাংলাদেশে সংক্রমিত রােগের মধ্যে অন্যতম। যদিও বাংলাদেশে ১৯৬৪ সালে প্রথম ডেঙ্গু রােগী চিহ্নিত হয়, তবে ২০০০ সালে প্রথমবারের মতাে এই ভাইরাসের সংক্রমণ বাংলাদেশে মহামারি আকার ধারণ করে।

চলতি বছর এ নিয়ে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৯ হাজার ৫৬৯ জনের শরীরে। এসব রোগীর মধ্যে ছাড়পত্র পেয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৮ হাজার ৪১৫ জন। বর্তমানে ভর্তি রয়েছে ১ হাজার ১১১ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার ৪১টি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৯৬৭ ডেঙ্গু রোগী।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে চলতি বছর ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত সাত মাসে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর ২৮ দিনে ২৯ জনের মৃত্যু হয়।

গত ২১ বছর ধরে দেশে ডেঙ্গুর সার্বিক বিষয় নিয়ে তথ্য জানাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

মূলত ২০১৯ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করে। সেই বছর এক লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। মারা যায় ১৪৮ জন। ডেঙ্গুতে এত মৃত্যু আর কখনও দেখেনি দেশ।

এর আগে ডেঙ্গুতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় ২০০২ সালে, সেবার ৫৮ জনের মৃত্যুর সংবাদ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ ছাড়া ২০০১ সালে ৪৪ জন মারা যায়।

২০১৯ সালে ডেঙ্গু ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেও করোনা মাহামারির মধ্যে ২০২০ সালে ডেঙ্গু তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে এবার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.